September 19, 2026, 3:38 am
শিরোনাম:
ডুমুরিয়ার খর্নিয়ায় গণসংযোগ ও কুশল বিনিময় চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী-শেখ শাহিনুর প্রতিবেশী ভারত-বাংলাদেশ সুসম্পর্কের জন্য যা করণীয় তপু বর্মণকে ছাড়াই আসিয়ান কাপের দল চূড়ান্ত বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে ভারত, ঢাকার ১০১ চুক্তি পর্যালোচনা নিয়ে জয়সওয়াল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ফের তারেক রহমানের দিল্লি সফর আয়োজনের চেষ্টা প্রেম করে বিয়ে বিষপানে স্বামীর মৃত্যু হাসপাতালে ভর্তি স্ত্রী অ্যাটর্নি অফিসের কেউ অর্থ পাচারে জড়িত থাকলে ব্যবস্থা যশোর মুক্তেশ্বরী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদের মাসিক সাহিত্য সভা ও কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা কেশবপুরে বিএনপি নেতা মরহুম আবু’র রুহের মাগফেরাত কামনায় দোয়া মাহফিল আশ্বিনের শুরুতেই আন্দামানে লঘুচাপের পূর্বাভাস, ঘূর্ণিঝড়ের শঙ্কা

প্রতিবেশী ভারত-বাংলাদেশ সুসম্পর্কের জন্য যা করণীয়

Reporter Name

ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ছাড়া বাংলাদেশ তিন দিক থেকে ভারতবেষ্টিত। দুই দেশের স্থলসীমা চার হাজার ৯৬ কিলোমিটার। চীনের পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি। এ প্রতিবেশীর সঙ্গে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে। অন্তর্বর্তী সরকার সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের উদ্যোগ নিলেও ভারতের সরকার জানিয়ে দেয়, বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে তারা সুসম্পর্ক স্থাপন করবে।

১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করলে নবনির্বাচিত সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিরলা অংশগ্রহণ করেন। তিনি নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির লেখা একটি চিঠিও হস্তান্তর করেন। পরবর্তী সময়ে ভারত সরকারের নানা কর্মক্রম ও পদক্ষেপকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রয়াস হিসেবে বিবেচনা করা যায়। ভারতের একজন রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে দেশটির হাইকমিশনার নিযুক্ত করা হয়েছে। তিনি ইতোমধ্যে ভারতে ভিজিট ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত ভিসা চালু করেছেন এবং বন্ধ হয়ে থাকা বিভিন্ন অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক করিডোর পর্যায়ক্রমে চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রতিনিয়ত প্রধানমন্ত্রী ও অন্য মন্ত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যেসব বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা, বিরোধ বা মতপার্থক্য রয়েছে, সেগুলো হচ্ছে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানিবণ্টন, অনাকাঙ্ক্ষিত সীমান্ত হত্যা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পারস্পরিক নিরাপত্তা, যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ, চাকরি, পর্যটন, চিকিৎসা ইত্যাদি কারণে উভয় দেশের জনগণের অস্থায়ী অভিবাসন, পরস্পরের সমুদ্র ও বিমানবন্দর ব্যবহার, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যে যাতায়াত ও পরিবহনে বাংলাদেশের করিডোর ব্যবহার, নেপাল কিংবা ভুটানে বাংলাদেশের মালপত্র পরিবহনে ভারতের যোগাযোগ অবকাঠামো ব্যবহার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি আমদানি ইত্যাদি। এই পারস্পরিক নির্ভরতার তালিকা আরও দীর্ঘ হতে পারে।

এ অবস্থায় আমাদের এমন এক কৌশলগত পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে হবে, যাতে প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট না হয়–যা অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে অতি গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন কারণে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লেও তা প্রশমিত করে বাস্তব সমস্যাগুলো নিরসনের দিকে দৃষ্টি দেওয়া এ মুহূর্তে করণীয়। দুই দেশের মন্ত্রণালয় পর্যায়ের পাশাপাশি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় পারস্পরিক যোগাযোগ, সফর ও সংলাপ যে কোনো সমস্যার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে পারে।

আমার পূর্ববর্তী একটি নিবন্ধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরের পর ভারত সফরের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছিলাম। দায়িত্ব নেওয়ার পরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানান। ভারতীয় একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায় যে আগস্টের প্রথম দিকে ভারতের পক্ষ থেকে এ আমন্ত্রণের পুনরাবৃত্তি হয়। একই সময়ে ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনের সম্প্রসারিত অধিবেশনে অংশগ্রহণের জন্যও আমন্ত্রণ জানানো হয়। স্বাভাবিকভাবে এবার বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংক্রান্ত সফরের পাশাপাশি বৃহত্তর আঞ্চলিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর এবং ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে সেই সফর হয়নি।

এ সফরে না যাওয়ার কারণ হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গত ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়াল অংশগ্রহণ এবং বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে (প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কেন নয়) আমন্ত্রণ জানানোর কথা বলা হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার পরপরই তাঁকে ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের জন্য ভারত সরকারকে অনুরোধ জানানো হয়। ভারত সরকার সেটি আইনানুগ বিবেচনার কথা বলে। কিন্তু শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের পূর্বশর্ত হতে পারে কিনা কিংবা ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দাওয়াত না দেওয়াকে প্রধানমন্ত্রীকে ‘অসম্মান’ জানানো হিসেবে ধরা যায় কিনা, তা গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।

শেখ হাসিনা ও তাঁর দলীয় নেতৃত্বের ভারতে অবস্থান বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। কারণ এটির সমাধান এ মুহূর্তে বাংলাদেশের হাতে নেই। সর্বোপরি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কোন্নয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ জড়িত। ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে এর নবায়ন কিংবা নতুন চুক্তি করতে হবে। তা ছাড়া তিস্তাসহ আরও অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টনও দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যু হয়ে আছে। স্থলসীমান্ত পথে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ ও উভয় দেশের বন্দর ব্যবহারে জটিলতার কারণে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য কমেছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। অবশ্য বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের অংশ হিসেবে ভারত বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা প্রদান, সীমান্ত হত্যা কমিয়ে আনা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ চালু রেখেছে।

বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশ ভারত থেকে আমদানি, আমাদের রপ্তানি মাত্র ১৫ শতাংশ। বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর জন্য বাড়তি বাজার প্রবেশাধিকার, ২০২৫ সালে আরোপিত স্থলবন্দরভিত্তিক বাণিজ্য বিধিনিষেধ প্রত্যাহার এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় ভারত একটি বিকল্প উৎস হতে পারে। এ ছাড়া বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের কাঁচামাল, বস্ত্র ও তৈরি পোশাকশিল্পের কাঁচামাল এবং পরিবহনের গাড়ির যন্ত্রাংশের অপেক্ষাকৃত সহজ ও সস্তা উৎস হলো ভারত।

গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পাদিত মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি বেড়েছে। তবে খাদ্যশস্য, জ্বালানি, তুলা, ডেইরি প্রডাক্ট যা-ই হোক না কেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি মূল্য বেশি, পরিবহন সময়সাপেক্ষ ও খরচ বেশি পড়ে। এর চাপ পড়বে দেশের ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের ওপর। কোনো নির্দিষ্ট দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের শর্ত যদি অন্য দেশের সঙ্গে লাভজনক বাণিজ্য হ্রাস করে, তবে সে নীতি জনকল্যাণমুখী হতে পারে না। এ যাবৎকাল বাংলাদেশের কোনো বাণিজ্য বা পারস্পরিক সম্পর্ক শর্তের বেড়াজালে আবদ্ধ ছিল না। তা ছাড়া নতুন বন্ধুত্ব গড়ে তোলার জন্য পুরোনো কার্যকর সম্পর্ক ভেঙে ফেলার কোনো অর্থনৈতিক যুক্তি নেই। সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়–এটিই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি। বিএনপির ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির সঙ্গে এ-যাবৎকাল অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতির কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। ইতোপূর্বে সব সরকার পররাষ্ট্রনীতি হিসেবে এটি পরিপালন করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও নিবন্ধ যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়িষ্ণু অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আভাস দিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে জাতীয় স্বার্থে কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে জোটভুক্ত বা তার ওপর অতিনির্ভরশীল না হয়ে সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের ভারতে দ্বিপক্ষীয় সফর বিলম্বিতকরণ ও ব্রিকস সম্মেলনে যোগদান না করার ইস্যুতে সাম্প্রতিক সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল মহলের বক্তব্য ও আচরণ অকূটনৈতিকসুলভ ও অবিবেচনাপ্রসূত বলে অনেকে মনে করেন, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আমাদের জাতীয় স্বার্থের জন্য অপরিহার্য। এ বিষয় আমাদের সরকার যত শিগগির অনুধাবন করতে পারবে ততই মঙ্গল। তবে নতজানু কোনো পররাষ্ট্রনীতি নয়, বরং নিজের আত্মমর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে বাস্তবমুখী নীতি অবলম্বন করতে হবে। রাজনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন থাকলে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও পারস্পরিক অন্যান্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্কে এর প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।

ভারত প্রসঙ্গে বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত ভারতের প্রতি নতজানু আনুগত্য নয়, আবার অহেতুক বিরোধিতাও নয়। শেখ হাসিনা ও সাজাপ্রাপ্ত তাঁর দলীয় অনুসারীদের বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের দাবি থেকে সরে আসা অবশ্যই নয়, তবে এটিকে কঠোর পূর্বশর্ত হিসেবে গণ্য করাও কূটনৈতিকভাবে বুদ্ধিমত্তার কাজ নয়। বরং শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে প্রত্যর্পণসহ সকল অমীমাংসিত ইস্যুর নিষ্পত্তি জরুরি। ভারত বিরোধিতা কোনো সস্তা জনপ্রিয়তার বিষয় নয়, বরং আলোচনা ও দরকষাকষির মাধ্যমে বাংলাদেশ অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর যতটুকু নিষ্পত্তি করতে পারে, সেটিই আমাদের অর্জন।

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া: সাবেক সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, সাবেক রাষ্ট্রদূত