November 2, 2026, 3:01 am

বিশ্বে প্রতিদিন ১২৩ নারীর মৃত্যু হয় প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণে

Reporter Name

প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ চিকিৎসাযোগ্য হলেও বিশ্বে প্রতিবছর হাজার হাজার নারীর প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। শুধু ২০২৩ সালেই বিশ্বে প্রায় ৪৫ হাজার নারীর মৃত্যু হয়েছে এ কারণে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন রোগটিতে ১২৩ নারীর মৃত্যু হয়। বিশ্বজুড়ে মাতৃমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এই জটিলতা, যাকে বলা হয় পোস্টপার্টাম হেমোরেজ (পিপিএইচ)। এসব মৃত্যুর অধিকাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে।

বিশ্ব মাতৃস্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সমন্বয়ে আজ ৫ অক্টোবর প্রথমবারের মতো পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব পিপিএইচ দিবস’। দিবসটির লক্ষ্য প্রসব পরবর্তী অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিরোধযোগ্য এই মাতৃমৃত্যু বন্ধে সরকার, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, অর্থায়নকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কার্যকর পদক্ষেপে উদ্বুদ্ধ করা।

ইন্টারন্যাশনাল কনফেডারেশন অব মিডওয়াইভস (আইসিএম) জানিয়েছে, সন্তান জন্ম দেওয়ার পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ প্রতিরোধ ও চিকিৎসার জন্য কার্যকর ওষুধ, সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু বিশ্বের সব নারীর কাছে এসব সেবা পৌঁছানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় সম্পদের সীমাবদ্ধতা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ওষুধের অনিয়মিত সরবরাহ এবং দক্ষ সেবাদানকারীর ঘাটতির কারণে ঝুঁকি বাড়ছে।

বিশ্ব পিপিএইচ দিবসের সূচনা হয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘পোস্টপার্টাম হেমোরেজ মোকাবিলায় রোডম্যাপ ২০২৩-২০৩০’-এর ওপর ভিত্তি করে। ওই রোডম্যাপে পিপিএইচ মোকাবিলাকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য এজেন্ডার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি সমন্বিত বৈশ্বিক উদ্যোগের আহ্বান জানানো হয়। গত দুই বছরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, পেশাজীবী সংগঠন ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে যৌথভাবে কাজ করেছেন। এ উদ্যোগে আইসিএমের সঙ্গে রয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব গাইনোকোলজি অ্যান্ড অবস্টেট্রিক্স (এফআইজিও), জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ), পার্টনারশিপ ফর ম্যাটারনাল, নিউবর্ন অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ (পিএমএনসিএইচ), রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ সাপ্লাইজ কোয়ালিশন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। পিপিএইচ অ্যাডভোকেসি ওয়ার্কিং গ্রুপ এবং বৈশ্বিক পিপিএইচ কমিউনিটি অব প্র্যাকটিসের মাধ্যমে বর্তমানে ৭০টির বেশি সংস্থা এই উদ্যোগে যুক্ত রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, বিশ্ব পিপিএইচ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো প্রতিরোধযোগ্য এই জটিলতায় মৃত নারীদের স্মরণ করা এবং যারা বেঁচে ফিরেছেন, তাদের ও তাদের পরিবারের অভিজ্ঞতা ও দাবিকে সামনে নিয়ে আসা। একই সঙ্গে সরকার ও অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে পিপিএইচ প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় অর্থ, নীতিমালা, ওষুধ, সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো।

পিপিএইচ মোকাবিলায় এরই মধ্যে কার্যকর বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জরায়ুর সংকোচন বাড়াতে ব্যবহৃত ইউটেরোটোনিকস, রক্তক্ষরণ কমাতে ট্রানেক্সামিক অ্যাসিড, সমন্বিত চিকিৎসা পদ্ধতি এবং দক্ষ মিডওয়াইফারি সেবা। এসব ব্যবস্থা দ্রুত ও যথাযথভাবে প্রয়োগ করা গেলে অনেক মাতৃমৃত্যু ঠেকানো সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

পিপিএইচ প্রতিরোধে বাংলাদেশেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওজিএসবির প্রাক্তন সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফেরদৌসি বেগম। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মিডওয়াইফদের জন্য ডিজিটাল ‘ডিসিশন-সাপোর্ট টুল’ চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণের প্রাথমিক লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সেবাদানকারীদের সহায়তা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া নাইজেরিয়া, ইথিওপিয়া, রুয়ান্ডা, ভারত, বাংলাদেশ ও কেনিয়ার মতো দেশগুলো জাতীয় নির্দেশিকা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে পিপিএইচ চিকিৎসার সমন্বিত পদ্ধতি বা ‘ট্রিটমেন্ট বান্ডেল’ অন্তর্ভুক্ত করেছে। কেনিয়ায় প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহব্যবস্থা ও সাপ্লাই চেইন পর্যবেক্ষণও জোরদার করা হয়েছে।

বিশ্ব পিপিএইচ দিবস উপলক্ষে আন্তর্জাতিক মাতৃস্বাস্থ্য সম্প্রদায় সরকার, অর্থায়নকারী সংস্থা ও স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারকদের পাঁচটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পিপিএইচ-জনিত প্রতিটি মাতৃমৃত্যুর সঠিক হিসাব রাখা ও তা প্রকাশ, প্রয়োজনীয় ওষুধ-সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ, সম্মুখসারির মিডওয়াইফ ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করা এবং দরিদ্র ও প্রান্তিক নারীদের জন্য সমতাভিত্তিক সেবা নিশ্চিত করা।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বার্তা স্পষ্ট, প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণে নারীর মৃত্যু অনিবার্য নয়। প্রয়োজনীয় ওষুধ, সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে এসব মৃত্যুর বড় অংশই প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব পিপিএইচ দিবস পালনের মধ্য দিয়ে শুধু সচেতনতা নয়, প্রতিরোধযোগ্য মাতৃমৃত্যু বন্ধে সরকার ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার জবাবদিহিতাও জোরদার করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।