November 2, 2026, 3:28 am

জ্বালানি নিরাপত্তায় পুরোনো পথে হাঁটছে সরকার

Reporter Name

বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় গত দেড় দশকে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বাড়ানো হয়েছে। কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি, কিন্তু সরকারকে বিপুল ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়েছে। ফল হিসেবে বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। আর জ্বালানি পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের চেয়ে এলএনজি আমদানির অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।

এসবের তীব্র সমালোচনা করে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, এলএনজি আমদানির সক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পথে হাঁটছে। ২০২৪ সালে নেট জ্বালানি আমদানি মোট ব্যবহারের ৪৮.৪৮ শতাংশে উঠেছিল। এখন তা আরও বেড়ে ৬৫ শতাংশ হয়েছে। ১৯৯০ সালে দেশের মোট ব্যবহৃত জ্বালানির মাত্র ১৪ শতাংশ আমদানি করতে হতো। সরকার পরিবর্তন হলেও আমদানিনির্ভরতা বাড়ানো, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ও ভর্তুকির চাপ কমাতে নীতিতে পরিবর্তন না আনা বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, আগের প্রশ্নবিদ্ধ নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকায় দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, সরকার পরিবর্তন হলেও জ্বালানি খাতের নীতিগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার উদ্যোগ স্পষ্ট হয়নি। কয়লা ও এলএনজিতে বিনিয়োগ বাড়ালেই জ্বালানি সংকটের সমাধান হবে না। এতে বরং আমদানিনির্ভরতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে।

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, বিদ্যমান সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক শামসুল আলম। তিনি বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকির চাপ কমানোর চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। উৎপাদন খরচ কেন বাড়ছে; বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতার কতটা ব্যবহার হচ্ছে এবং চুক্তির শর্তে সরকারের আর্থিক দায় কতটা– তা পর্যালোচনা করতে হবে। কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া ভোক্তার ওপর চাপ বাড়লেও সংকটের সমাধান হবে না। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমতে থাকলে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়বেই। তাই নতুন কূপ খননের পাশাপাশি অনুসন্ধানে বিনিয়োগ, বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানো এবং স্থলভাগ ও সমুদ্রে অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করা জরুরি। পুরোনো কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রমে কী অগ্রগতি হচ্ছে, সেটির মূল্যায়ন করতে হবে।

দাম বাড়িয়েও কমছে না ভর্তুকির চাপ

বিদ্যুত খাতে ২০১০-১১ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত ১ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে সরকারকে। এতে ভর্তুকির চাপ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি অর্থনীতি ও আর্থিক বিশ্লেষণ ইনস্টিটিউটের হিসাবে, ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। এই ব্যয় সামাল দিতে আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৪ দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ায়। এ সময়ে খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিটের দাম বৃদ্ধি পায় ১৮৮ শতাংশ। এর পরেও ভর্তুকির চাপ কমানো যায়নি। বিএনপি সরকারও চাপ সামাল দিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পথ নিয়েছে। গত ৩ জুন তারা বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এরপরও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি লাগতে পারে।

২০২২ সালের আগস্টে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তৎকালীন সরকার জ্বালানি তেলের দাম ৪২ থেকে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ায়। এতে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৪ টাকা এবং অকটেনের দাম ১৩৫ টাকায় পৌঁছায়। এর প্রভাবে পরিবহন ভাড়া, কৃষি উৎপাদন খরচ ও সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির কারণে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে তেল আমদানিতে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হওয়ায় বিএনপি সরকারও দফায় দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বিএনপি সরকারের সময়ে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ৩৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে বাজারে ডিজেল লিটারপ্রতি ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

গ্যাস অনুসন্ধানের চেয়ে আমদানিতে বেশি জোর

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমলেও নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলনে প্রয়োজনের তুলনায় কম গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর বিপরীতে এলএনজি আমদানির অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়। কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক খোলাবাজার থেকেও গ্যাস কেনা শুরু হয়। এতে সরবরাহ বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সরকারের ব্যয় ও ভর্তুকির চাপও বেড়েছে।

এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ৮ হাজার ৯০০ কোটি টাকা হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকি দিতে হয়েছে ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই এলএনজি আমদানিতে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি ছাড় করেছে সরকার। অথচ পুরো বছরের জন্য বরাদ্দ ছিল ৬ হাজার কোটি টাকা।

বর্তমানে কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে দৈনিক সর্বোচ্চ প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট এলএনজি গ্যাসে রূপান্তর করা যায়। গ্যাস সংকট কাটাতে বিএনপি সরকারও এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করছে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং শিল্পসহ সব খাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ২০২৯ সালের মধ্যে দেশে আরও তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

এর মধ্যে কক্সবাজারের কুতুবজোমে টার্মিনাল স্থাপনে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানির (সিএনইই) প্রস্তাব অনুমোদনের পর্যায়ে রয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়ার কথা বলছেন। কিন্তু এ খাতে বরাদ্দ ধারাবাহিকভাবে বাড়েনি। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের বাজেট বরাদ্দ ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল প্রায় ১ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ৯১১ কোটি টাকা হয়। বিএনপি সরকারের সময়েও বরাদ্দ খুব বেশি বাড়েনি। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ ২ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। এ বরাদ্দে উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয়ও রয়েছে। পুরো অর্থ গ্যাস অনুসন্ধানে ব্যয় হয় না।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, গ্যাসের সংকট কাটাতে শুধু এলএনজি আমদানি বা টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর নির্ভর করলে চলবে না। দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রে নতুন গ্যাসের সন্ধানে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।

কয়লাভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ফের জোর

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চাহিদার তুলনায় বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা হয়। চাহিদা না থাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ সক্ষমতা কাজে লাগানো যায়নি। ফলে বছরের অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে রেখে সরকারকে হাজার হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। চলতি বছর জ্বালানি সংকটে রেকর্ড পরিমাণ লোডশেডিংয়ের পর বিএনপি সরকারও বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও ২০২১ সালে ৮ হাজার ৪৫১ মেগাওয়াট সক্ষমতার ১০টি প্রস্তাবিত কেন্দ্র বাতিল করা হয়। বিএনপি সরকার পায়রা ও মাতারবাড়ীতে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট করে নতুন দুটি ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। এতে মোট ২ হাজার ৬৪০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হবে। তবে প্রকল্প দুটির অর্থায়ন এখনও চূড়ান্ত হয়নি। পায়রা প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে চীনের এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়ন চাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

১৫০ কূপের কর্মসূচি আগের সরকারের

দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ২০২২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ১৫০টি কূপ খনন কর্মসূচি নেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের পর বিএনপি সরকারও কর্মসূচিটি এগিয়ে নিচ্ছে। ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে।জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, কর্মসূচির আওতায় ৩০টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে এবং দৈনিক ১৪ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বেড়েছে। তবে পেট্রোবাংলার সূত্র জানিয়েছে, এর মধ্যে অধিকাংশ কূপের খননকাজ আগের সরকারের সময়েই সম্পন্ন হয়েছিল।