September 17, 2026, 8:55 pm
শিরোনাম:
কেশবপুর ১২২ জন ডেঙ্গু রোগ আক্রান্ত নেই মশা নিধনের কার্যক্রম সাগরদাঁড়িতে আনসার-ভিডিপির স্বেচ্ছাশ্রমে মশা নিধন কেশবপুরে গলায় ফাঁস দিয়ে এক মহিলার আত্মহত্যা দিঘলিয়ায় স্কুল বন্ধ নয়, কুকুরের ভয়ে সিঁড়ির গেটে তালা দিয়ে উপরে চলছে ক্লাস মথুরাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হলেন মো. রনি ইসলাম ডুমুরিয়ায় ভ্রাম্যমান আদালতে এক লক্ষ আট হাজার টাকা জরিমানা আদায় জবি ছাত্রদলের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ৩ শিক্ষার্থী সাংগঠনিক কিংবা রাজনৈতিক মাঠ পর্যায়ে গুছিয়ে উঠতে পারছে না বিএনপি ভয়ভীতি দেখিয়ে পদত্যাগ, দুই বছরেও স্বপদে ফিরতে পারেননি-অধ্যক্ষ অদ্রীস আনিসুল হকের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিচ্ছে দুদক

ইলিশের দেশে’ ইলিশ আসছে ভারত থেকে,দ্বিমুখী ইলিশ বাণিজ্য

Reporter Name

ভারতের গুজরাট থেকে ইলিশ পাঠানো হচ্ছে বাংলাদেশে। আবার যে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা এই ইলিশ বাংলাদেশে পাঠাচ্ছেন, তারাই এখন বাংলাদেশ থেকে পদ্মা মেঘনার ইলিশ নেওয়ার অনুমতি চাইছেন। ব্যবসায়ীদের এই দ্বিমুখী ইলিশ বাণিজ্যের পেছনে রয়েছে দুই ধরনের বাজারের চাহিদা।

গুজরাটের ভারুচ থেকে আসা ইলিশের বাংলাদেশের বাজারে অন্যতম আকর্ষণ এর ডিম। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা কম দামে বেশি ডিমওয়ালা গুজরাটের ইলিশ কিনে মাছ থেকে ডিম আলাদা করছেন। সেই ডিম প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত করে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। মাছের বাকি অংশও ফেলে দেওয়া হচ্ছে না। লবণ দিয়ে সংরক্ষণ, শুকানো বা অন্যভাবে প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করা হচ্ছে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ীদের চাহিদা সুস্বাদু পদ্মা-মেঘনার ইলিশে। দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে সেই ইলিশ আমদানির অনুমতি চেয়ে ভারতের ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন সম্প্রতি বাংলাদেশের কাছে আবেদন করেছে।

বাংলাদেশে ইলিশ পাঠাচ্ছেন, আবার বাংলাদেশ থেকেই ইলিশ চান হাওড়া হোলসেল ফিশ মার্কেট অ্যাসোসিয়েশন ও ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ার সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদ কলকাতার বিভিন্ন গণমাধ্যমকে বলেন, দুই থেকে তিন মাসে ভারত থেকে প্রায় ৫০০ টন ইলিশ বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহে আরও ১৫০ থেকে ২০০ টন পাঠানোর বরাত রয়েছে। গুজরাটের ভারুচ ও হাওড়ার পাইকারি বাজার থেকে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা এসব মাছ কিনছেন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই ও আগস্টে ২২টি প্রতিষ্ঠান তিন লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি ইলিশ আমদানি করেছে। এসব মাছের আমদানিমূল্য ছিল ছয় কোটি ৯২ লাখ ৯৪ হাজার ৫১০ টাকা। সব মিলিয়ে চলতি বছর সাড়ে ৯ মাসে ভারত থেকে এসেছে প্রায় চার লাখ ২৭ হাজার কেজি ইলিশ।

তবে এর মধ্যেই বাংলাদেশ থেকে ইলিশ নেওয়ার জন্য আবার আবেদন করেছে ভারতের ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন। ৯ সেপ্টেম্বর সংগঠনটি আলাদা চিঠি দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। একই সময়ে বাংলাদেশের ১৮টি প্রতিষ্ঠান ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি চেয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়েছে। এর আগেও একই সংগঠন বাংলাদেশ থেকে ইলিশ চেয়ে আবেদন করেছে। ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই সংগঠনটির পক্ষ থেকে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টার কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। ওই চিঠিতে ২০২৪ সালে অনুমোদিত দুই হাজার ৪২০ টনের বিপরীতে মাত্র ৫৭৭ টন ইলিশ ভারতে রপ্তানি হয়েছে।

২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বরও সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টার কাছে চিঠি দিয়ে দুর্গাপূজার আগে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি চেয়েছিলেন। ওই চিঠিতে বলা হয়েছিল, ২০১২ সালে বাংলাদেশ ইলিশ রপ্তানি বন্ধ করার আগ পর্যন্ত তারা বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানি করতেন।

গুজরাটের ইলিশের আকর্ষণ ডিমে গুজরাটের ভারুচ থেকে আসা ইলিশের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক হিসাব কিছুটা ভিন্ন। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, গুজরাটের ইলিশে ডিমের পরিমাণ বেশি। ভারতের বাজারে এই মাছের চাহিদা তুলনামূলক কম হলেও বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও সিলেটের বাজারে ডিমওয়ালা ইলিশের চাহিদা রয়েছে। ইলিশের ডিম আলাদা করে প্রক্রিয়াজাত ও পুনরায় রপ্তানি করা হচ্ছে বলে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের দাবি।

গুজরাটের ভারুচের ভাদভূত এলাকায় নর্মদা নদী সাগরে মিশেছে। ওই মোহনা এলাকায় গুজরাটে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ে। স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ীরা বলছেন, সেখান থেকে পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি বাংলাদেশেও রেফ্রিজারেটেড ট্রাকে ইলিশ পাঠানো হচ্ছে। বর্তমানে গুজরাটে ইলিশের দাম প্রতি কেজি ৭০০ থেকে ৮০০ ভারতীয় রুপি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম ৩০০ থেকে ৪০০ রুপিতে নেমে আসে। বাংলাদেশের আমদানিকারকদের কাছে পরিবহন খরচ বাদে গড়ে প্রায় ৬০০ রুপিতে মাছ বিক্রির কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ী আনোয়ার মাকসুদ।

ঢাকার কারওয়ান বাজারের মাছ ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ইলিশে তেমন ডিম থাকে না। কারণ ডিম ছাড়ার সময় নিষেধাজ্ঞা থাকে। তবে গুজরাটের ইলিশ সাইজে বড়, প্রচুর ডিম থাকে। ফলে গুজরাটের ইলিশ আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কিছু ব্যবসায়ীর মূল আগ্রহ মাছের ডিমে। মাছ থেকে ডিম আলাদা করে প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত করা হয়। এসব ডিম যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে পাঠানো হচ্ছে। ডিম আলাদা করার পর মাছের কিছু অংশ লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। কিছু অংশ শুকিয়ে বা অন্যভাবে প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করা হয়।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের চাঁদপুর নদীকেন্দ্রের একদল গবেষক ২০১৬ সালে ইলিশের ডিমের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করেন। ২০১৮ সালে প্রকাশিত ওই গবেষণায় বলা হয়, চাঁদপুরে অবতরণ করা নিম্নমানের বা কম দামের কিছু ইলিশ থেকে ডিম সংগ্রহ করা হয়। ডিম প্লাস্টিকের বাক্সে ভরে বরফ দিয়ে চট্টগ্রামের সি-ফুড কোম্পানিতে পাঠানো হয়। সেখান থেকে প্রক্রিয়াজাত ডিম ভারত, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানির তথ্য পাওয়া যায়।

তবে ইলিশের ডিমের বার্ষিক রপ্তানি কত গবেষণায় আরও দেখা যায়, ২০১৬ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বরের পর্যবেক্ষণকালে মোট তিন হাজার ২২৫টি প্রক্রিয়াজাত ইলিশের ডিমের বাক্স পরিবহনের তথ্য পাওয়া যায়। প্রতিটি বাক্সে প্রায় ২ দশমিক ৫ কেজি ডিম রাখা হতো। অর্থাৎ ওই পর্যবেক্ষণকালেই প্রায় আট টনের সমপরিমাণ প্রক্রিয়াজাত ডিমের বাক্স পরিবহনের হিসাব পাওয়া যায়। মৎস্য অধিদপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক বলেন, প্রতিবছর ইলিশ মাছের ডিম চট্টগ্রাম হয়ে বিদেশে এবং লোনা ইলিশ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টিন ভর্তি করে যাচ্ছে শুনেছি। কিন্তু এসবের হিসাব ও পরিসংখান আমরা রাখি না।

সিলেটের মৎস্য ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান বলেন, গুজরাটের ব্যবসায়ীরা কম দামে বেশি ডিমওয়ালা ইলিশ বাংলাদেশে পাঠাচ্ছেন। বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা সেই মাছের ডিম আলাদা করে প্রক্রিয়াজাতের পর রপ্তানি করছেন। মাছের বাকি অংশও লবণ দিয়ে সংরক্ষণ বা অন্যভাবে প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করছেন। অন্যদিকে একই ভারতীয় ব্যবসায়ী সংগঠন বাংলাদেশের কাছে পদ্মা-মেঘনার ইলিশ চাইছে। কারণ পশ্চিমবঙ্গের বাজারে বাংলাদেশের ইলিশের চাহিদা আলাদা। সেখানে স্বাদ, পরিচিতি ও দুর্গাপূজার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা খাদ্যসংস্কৃতি বড় বিষয়।