ব্যাংককে আইএমএফ বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা ঘিরে বৈশ্বিক বৈষম্য ও জনগণের সংগ্রাম বিশ্ব অর্থনীতি কার স্বার্থে পরিচালিত হবে—মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি ও বহুজাতিক করপোরেশনের মুনাফার জন্য, নাকি সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও জীবিকার নিশ্চয়তার জন্য? ১২–১৮ অক্টোবর ২০২৬ থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ–বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভাকে ঘিরে এই মৌলিক প্রশ্নই সামনে এসেছে।
একদিকে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকেরা ঋণ, বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা করছেন; অন্যদিকে কৃষক-শ্রমিক, নারী, পরিবেশবাদী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো ঋণবিচার, করবিচার, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং অর্থনীতির ওপর জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি তুলছে। ১৩–১৬ অক্টোবরের সিভিল সোসাইটি পলিসি ফোরামসহ বিভিন্ন কর্মসূচি প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংকট ও বিকল্পের প্রশ্নকে সামনে এনেছে।
ঋণের বোঝা জনগণের ঘাড়ে কেন ?
উন্নয়নশীল দেশগুলোকে একদিকে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যয় বজায় রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। উচ্চ সুদ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও জলবায়ু বিপর্যয়ের ঝুঁকি এই সংকট আরও গভীর করছে। ঋণ পরিশোধের স্বার্থে যদি মানুষের মৌলিক অধিকার সংকুচিত হয়, তবে সেই উন্নয়ন কার জন্য ?
ঋণের অর্থ কার স্বার্থে ব্যবহৃত হয়েছে, তার জবাবদিহি নিশ্চিত না করে জনগণের ওপর ঋণের বোঝা চাপানো অন্যায়। প্রয়োজন ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার সম্পর্কের গণতান্ত্রিক পুনর্বিন্যাস, অন্যায্য ঋণ বাতিল এবং কার্যকর ঋণ পুনর্গঠন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বৈদেশিক ঋণ, প্রকল্প ব্যয় ও ঋণ পরিশোধের দায় সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। ঋণদাতাদের শর্তের চেয়ে জনগণের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
কৃচ্ছ্রসাধন নয়, করবিচার চাই :
বাজেটের ভারসাম্য রক্ষার নামে দরিদ্র মানুষের ভর্তুকি কমানো, জনপরিষেবার ব্যয় সংকোচন কিংবা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া কোনো ন্যায়সংগত সমাধান নয়। রাজস্ব সংকট মোকাবিলায় সম্পদশালী ব্যক্তি ও বৃহৎ করপোরেশনের ওপর ন্যায্য কর আরোপ, কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার বন্ধ এবং সরকারি ব্যয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। করনীতি কেবল কারিগরি বিষয় নয়; এটি শ্রেণিস্বার্থ ও সম্পদ বণ্টনের প্রশ্ন। রাষ্ট্রের সম্পদ কার স্বার্থে ব্যয় হবে, তা নির্ধারণে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
জলবায়ু সংকটের দায় কার, ক্ষতিপূরণ দেবে কে ?
জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিপুল মুনাফা অর্জন করেছে শক্তিশালী শিল্পোন্নত দেশ ও করপোরেশনগুলো। অথচ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, নদীভাঙন ও ফসলহানির সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছে কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জনগণ। জলবায়ু অভিযোজনের নামে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে নতুন ঋণের ফাঁদে ফেলা চলবে না। প্রয়োজন অনুদানভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ঐতিহাসিকভাবে অধিক দূষণকারী দেশগুলোর ক্ষতিপূরণ। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারও হতে হবে জনগণের স্বার্থে করপোরেট মুনাফা বৃদ্ধির নতুন ক্ষেত্র হিসেবে নয়। সাশ্রয়ী জ্বালানি, পরিবেশ সুরক্ষা এবং জনগণের মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষকের জমি, খাদ্য ও উৎপাদনের অধিকার :
কৃষিকে শুধু বিনিয়োগ, উৎপাদন ও রপ্তানির পরিসংখ্যানে বিচার করা যায় না। জমি, বীজ, পানি ও খাদ্যব্যবস্থার ওপর কার নিয়ন্ত্রণ থাকবে, সেটিই মূল প্রশ্ন। ঋণনির্ভর ও করপোরেট-নিয়ন্ত্রিত কৃষি ক্ষুদ্র কৃষককে ব্যয়বহুল উপকরণ, বাজারের অনিশ্চয়তা ও ঋণের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। বাংলাদেশে খাসজমিতে ভূমিহীন মানুষের অধিকার, কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, স্থানীয় বীজের সুরক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি নিশ্চিত করতে হবে। নারী কৃষকের শ্রম ও জমির অধিকার স্বীকৃতি দিতে হবে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামষ্টিক ও প্রথাগত ভূমি অধিকার রক্ষা করতে হবে। খাদ্যকে করপোরেট মুনাফার পণ্য নয়, মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
জনগণের ঐক্যই বিকল্পের শক্তি :
ঋণবিচার, করবিচার, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও খাদ্য সার্বভৌমত্ব বিচ্ছিন্ন দাবি নয়। এগুলো একই সংগ্রামের অংশ—সম্পদ ও ক্ষমতার ওপর জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নীতি পরিবর্তন শুধু সভা-সেমিনারে দাবি জানিয়ে অর্জন করা যাবে না। প্রয়োজন কৃষক-শ্রমিকের ঐক্য, নারী ও আদিবাসী আন্দোলনের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক সংহতি। বাংলাদেশেও ঋণের স্বচ্ছতা, জনপরিষেবার সুরক্ষা, প্রগতিশীল করব্যবস্থা, ভূমির অধিকার ও জলবায়ু ক্ষতিপূরণের দাবিকে সমন্বিত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পরিণত করতে হবে।
ব্যাংককের সভা ঘিরে তাই প্রশ্নটি স্পষ্ট: অর্থনীতি কাদের জন্য, উন্নয়ন কার স্বার্থে এবং সম্পদের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে? যে অর্থনীতিতে মানুষের শ্রমে সম্পদ সৃষ্টি হয়, সেই অর্থনীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারও জনগণের থাকতে হবে। মুনাফার পৃথিবী নয়, মানুষের পৃথিবী গড়তে হবে।
জয় কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষের।
লেখক: বদরুল আলম ।