দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত রাষ্ট্রীয় সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দুর্বলতা নিয়ে কিংবা সংস্থাটিকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে কম কথা হয় না। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, সংস্থাটি শক্তিমত্তা, দক্ষতা তথা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে আজও কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছতে সক্ষম হয়নি।
বুধবার প্রকাশিত ‘মিথ্যা প্রমাণিত দুদকের ৫০ শতাংশ মামলা’ শীর্ষক প্রধান শিরোনাম সংস্থাটির এসব দুর্বলতার প্রশ্নটিকেই সামনে আনে। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকার বিশেষ জজ আদালতগুলোয় নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলোর তথ্য হতাশার ও উদ্বেগের। নিষ্পত্তি হওয়া মোট ৬২টি মামলার মধ্যে ৩১টিতেই আসামিরা বেকসুর খালাস পেয়েছেন। অর্থাৎ ৫০ শতাংশ মামলার ক্ষেত্রে দুদক তাদের আনীত অভিযোগ আদালতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এতে দুদকের তদন্ত ও চার্জশিটের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এও বলা হচ্ছে, দুদকের কিছু মামলা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না ?
একটি দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান, তদন্ত এবং চার্জশিট দাখিলের জন্য দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া পার হতে হয়। অথচ বছরের পর বছর বিচারাধীন থাকা এসব মামলায় শেষ পর্যন্ত যখন প্রমাণ মেলে না, তখন সে দায়ভার আসলে কার? প্রমাণের অভাবে আসামিরা খালাস পেয়ে যায়। কিন্তু বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় তাদের যে মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক ক্ষতি হয়ে যায়, তার দায় কি কেউ নেয়? অনেককে বছরের পর বছর কারাবাস করতে হয়, জনসম্মুখে তাদের সামাজিকভাবে হেয় হতে হয়। অনুসন্ধানের অস্বচ্ছতা এবং তথ্যপ্রমাণের ঘাটতি বা দুর্বলতার কারণে নিরপরাধ মানুষের এমন ভোগান্তি বা হয়রানি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে অতীতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে অনেক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা হয়। তার মানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের উদ্দেশ্যে এ কমিশনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা রয়েছে বরাবরই। খুব স্বাভাবিভাবেই সংস্থাটির ওপর আস্থার সংকট নিয়ে বিভিন্ন সময় আলোচনা হতে দেখা যায়। এ ছাড়া সংস্থাটির দুর্বলতার দিক যেমন, তদন্ত কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, দায়িত্বহীনতা কিংবা প্রমাণের সঠিক নথি সংরক্ষণে ব্যর্থতার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর ফলে অনেক প্রকৃত মামলা শেষ পর্যন্ত আদালতে টিকতে পারে না।
আমরা মনে করি, দুদকের মতো স্বায়ত্তশাসিত একটি সংস্থাকে যদি শক্তিশালী করে গড়ে তোলা না যায়, তাহলে আমাদের অন্যতম প্রধান সংকট দুর্নীতি থেকে রেহাই মিলবে না। একথা সবারই জানা, শুধু দুর্নীতির কারণে দেশের সব ধরনের অগ্রগতি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই, দুদককে কার্যকর ও জনগণের আস্থাভাজন সংস্থায় পরিণত করতে হলে এর প্রয়োজনীয় সংস্কার জরুরি। বিশেষ করে সংস্থাটি যেন রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হতে পারে, এ প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিমত্তা নিশ্চিত হওয়া দরকার। যদি রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তবেই এ সংস্থার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সফল হতে পারে।
আমরা আশা করি, নিরপেক্ষ অনুসন্ধান, নিখুঁত প্রমাণ সংগ্রহ এবং স্বচ্ছ চার্জশিট গঠন নিশ্চিত করে দুদক প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তির মুখোমুখি করবে। পাশাপাশি নিরপরাধ নাগরিকের হয়রানি বন্ধ করে মানুষের বিচার পাওয়ার অধিকার ও আস্থা ফিরিয়ে আনবে। আমাদের প্রত্যাশা, নতুন কমিশন অতীতের দুর্বলতা চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট ও জবাবদিহিমূলক সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করবে, যাতে করে সত্যিকারই একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন সংস্থায় পরিণত হতে পারে।