এস কে রবিউল ইসলাম, খুলনা: হাতে এক টাকাও নেই, পাশে কেবল একজন বৃদ্ধা মা। গভীর রাতে দ্বিতীয়বার সিজারিয়ান অপারেশনের জরুরি প্রয়োজন অর্থসংকটে চিকিৎসা বন্ধ হওয়া যখন কেবল সময়ের ব্যাপার, ঠিক তখনই অনন্য এক মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করল খুলনার কয়রা হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার। বাক্প্রতিবন্ধী ও স্বামী পরিত্যক্তা জহরা খাতুনের জরুরি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করে চিকিৎসকরা জন্ম দিয়েছেন এক ফুটফুটে কন্যাশিশু। শুধু তা-ই নয়, সার্জন ফিসহ চিকিৎসা ও ওষুধের প্রায় ২০ হাজার টাকা পুরোটাই মওকুফ করে মা ও নবজাতককে সুস্থ অবস্থায় বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
ভুক্তভোগী ৪৫ বছর বয়সী জহরা খাতুন পাইকগাছা উপজেলার গড়ইখালী ইউনিয়নের গড়ইখালী গ্রামের বাসিন্দা। বর্তমানে তিনি কয়রা উপজেলার হায়াতখালী বাজারের মঠবাড়ী এলাকায় বসবাস করছেন। স্বজনরা জানান, প্রায় পাঁচ মাস আগে স্বামী হবি গাইন তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর বৃদ্ধা মাকে নিয়ে চরম অভাব-অনটনে দিন কাটছিল তার। এরই মধ্যে গভীর রাতে প্রসববেদনা ও শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে দ্রুত কয়রা হাসপাতালে নেওয়া হয়।
হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দ্রুত দ্বিতীয় সিজারের সিদ্ধান্ত দেন। তবে প্রসবকালীন এই জটিল মুহূর্তে প্রয়োজনীয় টাকা কিংবা সার্জন ফি দেওয়ার মতো সামর্থ্য ছিল না পরিবারটির। এমনকি সঙ্গে থাকা বৃদ্ধা মায়ের কাছেও ছিল না কোনো অর্থ। এমন অবস্থায় রোগীর জীবন ও সন্তানের সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে ঝুঁকি নিয়েই জরুরি অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সফল অস্ত্রোপচারে একটি সুস্থ কন্যা শিশুর জন্ম হয়।অস্ত্রোপচার সফল হলেও অর্থসংকট কাটছিল না। সার্জন ফি বাবদ ৭ হাজার টাকা এবং ওষুধ ও অন্যান্য সেবা মিলিয়ে সর্বমোট প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচের খতিয়ান সামনে আসে। অসহায় পরিবারটির এই মানবিক সংকটের কথা জানতে পেরে এগিয়ে আসেন কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ রেজাউল করিম।
তিনি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলমগীর হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানান। এ বিষয়ে কয়রা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, “রোগীর পরিবারের চরম অসহায়ত্বের কথা জানতে পেরে সম্পূর্ণ মানবিক দিক বিবেচনা করেই আমরা কোনো টাকা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। সার্জন ফিসহ সমস্ত খরচ হাসপাতাল থেকে বহন করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধও বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছে। মা ও নবজাতক সুস্থভাবে বাড়ি ফিরেছেন—একজন চিকিৎসাসেবী হিসেবে এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।”
স্থানীয়রা জানান, অর্থের অভাবে যেখানে অনেক অসহায় পরিবার চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়, সেখানে কয়রা হাসপাতালের এমন উদ্যোগ সুশীল সমাজে মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এটি অন্য প্রতিষ্ঠান ও বিত্তবানদেরও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করবে। এদিকে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা পেয়ে ও জীবনের ঝুঁকি কেটে যাওয়ায় হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন জহরা খাতুনের পরিবার।